লাভলী চৌধুরী তাঁর সাহিত্যে একটি নতুন আত্মিক ভাষা তৈরী করেছেন
লাভলী চৌধুরী ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন মহিয়সী নারী| তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রধান ˆবশিষ্ট্য ছিল মার্জিত রুচিবোধ, অটল সততা, গভীর মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক প্রগতিশীল চিন্তার চমৎকার এক মেলবন্ধন। তিনি আভিজাত্য বা ˆবষয়িক মোহের পেছনে ছোটেননি; বরং তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছিলেন জ্ঞানচর্চার প্রসারে এবং অবহেলিত মানুষের কল্যাণে। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল ‘সৃজনের আলোয় লাভলী চৌধুরী’ গ্রন্থে লাভলী চৌধুরীর একটি নতুন আত্মিক ভাষার সুবাসকে উন্মোচন করেছেন|
সিলেটের সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘পাণ্ডুলিপি প্রকাশন’-এর উদ্যোগে সিলেটের মননশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব কবি, গবেষক ও বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী লাভলী চৌধুরী’র গৌরবময় জীবন ও সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে লেখক, প্রকাশক ও সংগঠক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল রচিত ‘সৃজনের আলোয় লাভলী চৌধুরী’ গ্রন্থের পাঠ আলোচনা ও সুহৃদ আড্ডায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গতকাল শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় নগরীর পূর্ব জিন্দাবাজারস্থ একটি হোটেলের কনফারেন্স হলে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
‘সৃজনের আলোয় লাভলী চৌধুরী’ গ্রন্থ পাঠ আলোচনা পর্ষদ-এর আহ্বায়ক বেলাল আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রিন্সিপাল কবি কালাম আজাদ, লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর নন্দলাল শর্মা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সংগঠক লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর, শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক মিহির কান্তি চৌধুরী, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী, কবি, গল্পকার ও সমাজচিন্তক সালেহ আহমদ, সিলেট লেখিকা সংঘ-এর সভানেত্রী রওশন আরা চৌধুরী, কবি, নাট্যকার ও সংগঠক ফাতির আহমদ, সংগঠক সালেহ আহমদ খসরু, অনুভূতি ব্যক্ত করেন গ্রন্থের লেখক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল এবং মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক ˆসয়দ কামাল আহমদ বাবু।
তরুণ সমাজচিন্তক ও আবৃত্তি শিল্পী আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ ও সাংবাদিক জালাল জয়-এর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কবি ও শিক্ষাবিদ বাছিত ইবনে হাবীব, কবি শামীমা আক্তার ঝিনু, অধ্যক্ষ মোঃ ছয়ফুল করিম চৌধুরী হায়াত, কবি সেনুয়ারা আক্তার চিনু, কবি ধ্রুব গৌতম, কবি ও ঔপন্যাসিক মোঃ আব্দুল হক, কবি মাসুদা সিদ্দিকা রুহী, কবি ইশরাক জাহান জেলী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন কবি লাভলী চৌধুরীর সন্তান জাফর সাদেক শাকিল। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কবি, প্রাবন্ধিক আব্দুল বাছিত। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ছামিউল ওয়াজেদ চৌধুরী (জিলান)। অনুষ্ঠানের গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিবৃন্দ।
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে প্রিন্সিপাল কবি কালাম আজাদ বলেন, লাভলী চৌধুরীর কবিতা মূলত আত্মানুসন্ধান, প্রকৃতিপ্রেম, দেশপ্রেম এবং পরম করুণাময়ের প্রতি গভীর সমর্পণের বাণী বহন করে। তাঁর কাব্যচেতনায় একদিকে যেমন রয়েছে সিলেটের নদী-পাহাড়-চা বাগানের ˆনসর্গিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে মানুষের প্রতি অপার ভালোবাসা। লাভলী চৌধুরীকে নিয়ে গ্রন্থ লিখে বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল চমৎকার কাজ করেছেন।
গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর নন্দলাল শর্মা বলেন, লাভলী চৌধুরী ছিলেন স্বভাব লেখক। তাঁর রক্তে সৃজনশীলতা প্রবহমান ছিল। তাঁর নানা ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন। লাভলী চৌধুরীও নানার মতো সাহিত্যে নিজের উল্লেখযোগ্য অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘সৃজনের আলোয় লাভলী চৌধুরী’ গ্রন্থ তার সার্থক উদাহরণ।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সংগঠক লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর বলেন, ‘সৃজনের আলোয় লাভলী চৌধুরী’ কেবল একটি গ্রন্থ পর্যালোচনা বা জীবনী গ্রন্থ নয়, এটি মূলত একটি চেতনার নাম। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল অত্যন্ত সফলভাবে লাভলী চৌধুরীর জীবনের ‘সৃজন’ এবং ‘আলো’—এই দুই ধারাকে একবিন্দুতে মেলাতে পেরেছেন। লাভলী চৌধুরী তাঁর সাহিত্য, কর্ম ও সমাজসেবার মাধ্যমে যে আলো ছড়িয়েছেন, সেই আলো কখনোই নিভে যাওয়ার নয়| বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক মিহির কান্তি চৌধুরী বলেন, লাভলী চৌধুরীর সৃজনশীলতা ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতার পরিচায়ক। লাভলী চৌধুরীর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল লোকসাহিত্য, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তাঁর গবেষণা কোনো শুষ্ক তাত্ত্বিক কচকচানি নয়, বরং তা হৃদয়গ্রাহী এবং তথ্যসমৃদ্ধ। তিনি অত্যন্ত ˆধর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং তা সহজ গদ্যে উপস্থাপন করতেন। এ বিষয়ে চমৎকার আলোকপাত করেছেন বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল।
কবি, গল্পকার ও সমাজচিন্তক সালেহ আহমদ বলেন, লাভলী চৌধুরী ধর্মকে কোনো সংকীর্ণ আচার-সর্বস্বতার মধ্যে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন মানবিকতার সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে। তাঁর ধর্মীয় চেতনা উদার, মানবিক এবং আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত। তিনি তাঁর লেখায় ও জীবনে এই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল তাঁর কবিতার পঙক্তিমালা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে তাঁর কাব্যিক রূপক ও প্রতীকগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক ও ˆনতিক বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল কবি লাভলী চৌধুরীর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলোর সারনির্যাস নিয়ে এসেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে।
কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী বলেন, লাভলী চৌধুরী ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ এক নারী। তিনি অত্যন্ত ভক্তি, নিষ্ঠা এবং ঐতিহাসিক সত্যতার ওপর ভিত্তি করে উম্মাহাতুল মুমিনীন তথা নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের জীবন ও চরিত্র তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি জীবনী গ্রন্থ নয়, বরং আধুনিক মুসলিম নারীদের জন্য একটি আদর্শ আচরণবিধি ও গাইডলাইন। শাহজালাল (রহ.)-কে লিখিত গ্রন্থটিও এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল সত্যিই তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন।
অনুভূতি ব্যক্ত করে গ্রন্থের লেখক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল বলেন, লাভলী চৌধুরীর জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো সিলেটের নারীসমাজকে সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা। আমার এই গ্রন্থটি পড়ে সিলেটের নারী সাহিত্যিকরা যদি এগিয়ে আসেন এবং লাভলী চৌধুরীর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ব্রতী হন, তাহলে এটাই আমার সার্থকতা। আপনারা যেভাবে ভালোবাসাপাশে আবদ্ধ করেছেন, তাতে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।
সভাপতির বক্তব্যে বেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, লাভলী চৌধুরী ছিলেন এক মহিয়সী নারী—যার জীবন আমাদের দেখায় যে, সাহস, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সৃজনশীলতা একত্রিত হলে সমাজ ও মানুষের জীবনে কতোটা প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। তার জীবনকাহিনী শুধুমাত্র স্মরণীয় নয়, বরং তা একটি শক্তিশালী প্রেরণা, যা বহু মানুষকে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে অনুপ্রাণিত করে। আপনারা উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করায় সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। বিজ্ঞপ্তি